সোনারগাঁও বাংলাদেশের প্রাচীন রাজধানীসোনারগাঁও হলো বাংলাদেশের আদি রাজধানী এবং মুসলিম
শাসকদের অধীনে পূর্ববঙ্গের একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র । এটি বর্তমানে বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার একটি উপজেলা । এর অবস্থান ঢাকা থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দক্ষিণ পূর্বে । মধ্যযুগীয় নগরটির যথার্থ অবস্থান নির্দেশ করা কঠিন । বিক্ষিপ্ত নিদর্শনাদি থেকে প্রতীয়মান হয় যে এটি পূর্বে মেঘনা এবং পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা, দক্ষিণে ধলেশ্বরী ও উত্তরে ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বেষ্টিত একটি বিস্তৃত জনপদ ছিল ।
আর মূলত এটি ছিল ঈশা খাঁর আমলে রাজধানী ।
ঈশা খাঁর স্ত্রী সোনাবিবির নামে সোনারগাঁও এর নাম রাখা হয় ।
এখানে সোনাবিবির মাজার আছে ও পাঁচবিবির মাজার আছে এবং গিয়াস উদ্দিন আযম শাহের সমাধি রয়েছে । এছাড়াও সোনারগাঁওয়ে ইব্রাহীম দানিশমান্দ এর দরগা এবং আরো নানারকম ইত্যাদি স্থাপনা রয়েছে । সোনারগাঁও এ শিল্পাচার্য জয়নুল লোক এবং কারুশিল্প জাদুঘর অবস্থিত । এক সময় পানাম নগর এই এলাকাটি উন্নিশ শতকে সোনারগাঁওয়ের উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ীদের সব থেকে ভালো একটি বাসস্থান ছিলো । এখানে সব থেকে বেশি কাপড় ব্যবসায়ীরা বাস করতেন । এখানকার সুদৃশ্য বাড়িগুলো এখন ধ্বংসের মুখে পরে আছে ।
==============================================================
ঈসা খান
ঈসা খাঁ বাংলার বারো ভুঁইয়ার প্রধান । ঈসা খাঁ এবং আরো বার জন জমিদার একসাথে বাংলায় স্বাধীনভাবে জমিদারী স্থাপন করে । ঈসা খাঁর বাংলো বাড়ি কিশোরগঞ্জে অবস্থিত । তিনি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার সেইসময়ের জমিদার কুইচ রাজাকে সিংহাসন চ্যুত করে বাংলো বাড়িটি র্নিমান করেন । ১৫৭৫ সালে সম্রাট আকবর বাংলা বিজয়ের পর বারো ভূইয়াদের ক্ষমতা কমে যায় । তখন সম্রাট আকবর বারো ভূইয়াদের ক্ষমতা থেকে সরাতে অভিযান করেন কিন্তু ব্যর্থ হন । তখন সম্রাট আকবরের সেনাপতিকে পাঠান ঈসা খাঁকে হত্যার জন্য কিন্তু বীর ঈসা খাঁর সাথে সেনাপতি যুদ্ধে পরাস্থহন । ঈসা খাঁ বারো ভূঁইয়াদের নেতা ছিলেন । মুঘল সেনাপতি মানসিংহ জীবনে দুব্যক্তিকে পরাজিত করতে পারেননি চিতরের রানা প্রতাপ সিং ও ঈসা খাঁ । ১৫৩৭ সালে ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার সরাইল পরগণায় ঈসা খাঁর জন্ম হয় । তার পিতা কালিদাস গজদানী ভাগ্যান্বেষণে অযোধ্যা থেকে গৌড়ে এসে নিজ প্রতিভা গুণে রাজস্বমন্ত্রী পদে উন্নীত হন । পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তার নাম হয় সুলাইমান খাঁ ।তিনি সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের ১৫৩৩ ৩৮ মেয়েকে বিয়ে করে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার সরাইল পরগণা এবং পূর্ব মোমেনশাহী অঞ্চলের জায়গীরদারী লাভ করেন । ১৫৪৫ সালে শের শাহের পুত্র ইসলাম শাহ দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করার পর সুলাইমান খাঁ দিল্লীর আনুগত্য অস্বীকার করলে কৌশলে তাকে হত্যা করে তার দুই নাবালক পুত্র ঈসা খাঁ এবং ইসমাইল খাঁকে একদল তুরানী বণিকের নিকট বিক্রি করে দেন । ১৫৬৩ সালে ঈসা খাঁর চাচা কুতুব খাঁ রাজকার্যে নিযুক্তি লাভ করে বহু অনুসন্ধানের পর সুদূর তুরান দেশের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছ থেকে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে দুই ভাতিজাকে উদ্ধার করেন । এই সময় ঈসা খাঁর বয়স মাত্র ২৭ বছর ছিল । সুলতান তাজ খাঁ কররানী ১৫৬৪ সাল থেকে ৬৫ সালের ভেতর সিংহাসনে আরোহণ করে ঈসা খাঁ কে তার পিতার জায়গীরদারী ফেরত দেন । বাংলার শেষ স্বাধীন সুলতান দাউদ খাঁ কররানীর রাজত্বকালে ১৫৭২ সাল থেকে ৭৬ সালে ঈসা খাঁ বিশেষ প্রতিপত্তি লাভ করেন তার অসাধারণ বীরত্বের জন্যে । ১৫৭৫ সালের অক্টোবর মাসে বাংলার সুবাদার মুনিম খাঁ র মৃত্যু হলে আফগান নেতা দাউদ খাঁ কররানী স্বাধীনতা ঘোষণা করে নিজ নামে বাংলা এবং বিহারে খুতবা পাঠ করান । স্বাধীন ভূইয়ারাও তাকে অনুসরণ করে মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হলেন । এরপর অনেক বীরত্বগাথাঁ রচিত হয় । সর্বশেষ ১৫৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বিক্রমপুর হতে ১২ মাইল দূরে ঈসা খাঁ মাসুম খাঁ কাবুলীর সম্মিলিত বাহিনী দুর্জন সিংহকে মানসিংহের ছেলে বাধা দিলে দুর্জন সিংহ বহু মুঘল সৈন্যসহ নিহত হলেন । অনেকে বন্দী হলেন । কিন্তু সুচতুর ঈসা খাঁ মুঘলদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা উচিত বলে মনে করে আকবরের বশ্যতা স্বীকার করে নেন । তিনি বন্দীদের মুক্তি দেন এবং মানসিংহের সাথে আগ্রায় গিয়ে সম্রাট আকবরের সাথে সাক্ষাত করেন । সম্রাট এ বীর পুরুষকে দেওয়ান ও মসনদ ই আলা উপাধিতে ভূষিত করেন । ১৫৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তার মৃত্যু হয় ।
বারো ভুঁইয়া
মোগল সম্রাট আকবর এর আমলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল শাসনকারী কতিপয় জমিদার বা ভূস্বামী বারো জন এমন শাসক ছিলেন যাদেরকে বোঝানো হতো বারো ভূঁইয়া বলে । বাংলায় পাঠান কররানী বংশের রাজত্ব দূর্বল হয়ে পড়লে বাংলাদেশের সোনারগাঁও এবং খুলনা ও বরিশাল বিভিন্ন অঞ্চলে কিছু সংখ্যক জমিদার স্বাধীন রাজার মতো রাজত্ব করতে থাকেন । সম্রাট আকবর ১৫৭৫ সালে বাংলা দখল করার পর এসকল জমিদার ঐক্যবদ্ধ হয়ে মোগল সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন । বারো ভুঁইয়া নামে পরিচিত এই সকল জমিদার গণ হলেনঃ
১। ঈসা খাঁ খিজিরপুর বা কত্রাভূ ।
২। প্রতাপাদিত্য যশোর বা চ্যাণ্ডিকান ।
৩। চাঁদ রায় কেদার রায় শ্রীপুর বা বিক্রমপুর ।
৪। কন্দর্প রায় এবং রামচন্দ্ররায় বাকলা বা চন্দ্রদ্বীপ ।
৫। লক্ষ্মণমাণিক্য ভুলুয়া ।
৬। মুকুন্দরাম রায় ভূষণা বা ফতেহাবাদ ।
৭। ফজল গাজী ভাওয়াল এবং চাঁদপ্রতাপ ।
৮। হামীর মল্ল বা বীর হাম্বীর বিষ্ণুপুর ।
৯। কংসনারায়ন তাহিরপুর ।
১০। রামকৃষ্ণ সাতৈর বা সান্তোল ।
১১। পীতম্বর ও নীলম্বর পুঁটিয়া ।
১২ ।ঈশা খাঁ লোহানী এবং উসমান খাঁ লোহানী উড়িষ্যা ও হিজলী ।
সম্রাট আকবর ১৫৫৬ সাল থেকে ১৬০৫ সাল তাঁর জীবদ্দশায় সমগ্র বাংলার উপর মুঘল অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হতে পারেননি । কারণ বাংলার বড় বড় জমিদারেরা স্বাধীনতা রক্ষার জন্যে মুঘলদের বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়তেন । তারা বারভূঁইয়া নামে পরিচিত ।এখানে বার বলতে অনির্দিষ্ট সংখ্যা বুঝায় ।
ঈসা খাঁ বারভূঁইয়াদের নেতা ছিলেন ।মুঘল সেনাপতি মানসিংহ জীবনে দুইব্যক্তিকে পরাজিত করতে পারেননি ১ জন চিতরের রানা প্রতাপ সিং ২য় জন হলেন ঈসা খাঁ । ১৫৩৭ সালে ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার সরাইল পরগণায় ঈসা খাঁর জন্ম হয় । তার পিতা কালিদাস গজদানী ভাগ্যান্বেষণে অযোধ্যা থেকে গৌড়ে এসে স্বীয় প্রতিভা গুণে রাজস্বমন্ত্রী পদে উন্নীত হন । পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তার নাম হয় সুলাইমান খাঁ ।তিনি সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের ১৫৩৩ সাল থেকে ৩৮ সালে মেয়েকে বিয়ে করে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার সরাইল পরগণা এবং পূর্ব মোমেনশাহী অঞ্চলের জায়গীরদারী লাভ করেন ।১৫৪৫ সালে শের শাহের পুত্র ইসলাম শাহ দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করার পর সুলাইমান খাঁ দিল্লীর আনুগত্য অস্বীকার করলে কৌশলে তাকে হত্যা করে তাঁর দুই নাবালক পুত্র ঈসা খাঁ এবং ইসমাইল খাঁকে একদল তুরানী বণিকের নিকট বিক্রি করা হয় ।১৫৬৩ সালে ঈসা খাঁর চাচা কুতুব খাঁ রাজকার্যে নিযুক্তি লাভ করে বহু অনুসন্ধানের পর সুদূর তুরান দেশের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছ থেকে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে দুই ভাতিজাকে উদ্ধার করেন । এই সময় ঈসা খাঁর বয়স মাত্র ২৭ বছর ।সুলতান তাজ খাঁ কররানী ১৫৬৪ সাল থেকে ৬৫ সাল সিংহাসনে আরোহণ করে ঈসা খাঁকে তাঁর পিতার জায়গীরদারী ফেরত দেন । বাংলার শেষ স্বাধীন সুলতান দাউদ খাঁ কররানীর রাজত্বকালে ১৫৭২ সাল থেকে ৭৬ সাল ঈসা খাঁ বিশেষ প্রতিপত্তি লাভ করেন অসাধারণ বীরত্বের জন্যে ।
১৫৭৫ সালের অক্টোবর মাসে বাংলার সুবাদার মুনিম খাঁর মৃত্যু হলে আফগান নেতা দাউদ খাঁ কররানী স্বাধীনতা ঘোষণা করে নিজ নামে বাংলা এবং বিহারে খুতবা পাঠ করান ।স্বাধীন ভূঁইয়ারাও তাকে অনুসরণ করে মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেন ।
এরপর অনেক বীরত্বগাথাঁ রচিত হয় ।সর্বশেষ ১৫৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বিক্রমপুর হতে ১২ মাইল দূরে ঈসা খাঁ ও মাসুম খাঁ কাবুলীর সম্মিলিত বাহিনী দুর্জন সিংহকে মানসিংহের ছেলে বাধা দিলে দুর্জন সিংহ বহু মুঘল সৈন্যসহ নিহত হন ।অনেকে বন্দী হন । কিন্তু সুচতুর ঈসা খাঁ মুঘলদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা উচিত বলে মনে করে আকবরের বশ্যতা স্বীকার করে নেন ।তিনি বন্দীদের মুক্তি দেন এবং মানসিংহের সাথে আগ্রায় গিয়ে সম্রাট আকবরের সাথে সাক্ষাত করেন ।সম্রাট এ বীর পুরুষকে দেওয়ান ও মসনদ ই আলা উপাধিতে ভূষিত করেন ।১৫৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তার মৃত্যু হয় ।
মাসুম খাঁ কাবুলীঃ তিনি প্রথমে সম্রাট আকবরের সেনাপতি ও বাংলার শাসনকার্যে নিয়োজিত ছিলেন।আকবরের "দ্বীন-ই-এলাহী" প্রবর্তন করলে মুঘল কর্মকর্তারা বাংলায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।মাসুম খাঁ ছিলেন বিদ্রোহীদের অন্যতন নেতা।জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি মুঘল বিরোধীতা অক্ষুণ্ন রাখেন।১৫৯৯ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
মুসা খাঁ---- ঈসা খাঁর পুত্র মুসা খাঁ সম্রাট জাহাংগীরের আমলে (১৬০৫-২৭) ভূঁইয়াদের মধ্যে সর্বাপাক্ষা শক্তিশালী ছিলেন।তিনি মুঘল আনগত্য অস্বীকার করে তাদের বিরুদ্ধে আজীবন যুদ্ধ করেন।বৃহত্তর ঢাকা,কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ জেলার অধিকাংশ স্থান নিয়ে তাঁর রাজত্ব গঠিত হয়েছিল।সোনারগাঁ ছিল তাঁর রাজধানী।১৬১১ সালের এপ্রিল মাসে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে সোনারগাঁয়ের পতন ঘটে।মুসা খাঁ মুঘলদের আনুগত্য স্বীকার করেন।
ফজল গাজী তিনি শেরশাহ এবং সম্রাট আকবরের সমসাময়িক।বীরত্বের জন্য খ্যাতি অর্জন করেন।মুঘলদের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করেন।
বাহাদুর গাজীঃ তিনি তাঁর বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে মুঘলদের বিরুদ্ধে মুসা খাঁকে যথেষ্ট সাহায্য করেন।মুসা খাঁ পরাজিত হলে বাহাদুর গাজী মুঘলদের পক্ষে যোগদান করে যশোর ও কামরূপ অভিযানে অংশ নেন।
খাজাউসমান খাঁ লোহানী তিনি কখনো মুঘলদের আনুগত্য স্বীকার করেননি এবং প্রাণ বিসর্জন দেন।তিনি ২ হাজার অশ্বারোহী, ৫ হাজার পদাতিক ও ৪০ টি হস্তীর এক বাহিনী নিয়ে মুঘলবাহিনীর গতিরোধ করতে উষার ত্যাগ করেন।শেরে ময়দান,খাজা ইব্রাহীম এবং খাজা দাউদ প্রমুখ আফগান নেতৃবৃন্দ স্ব স্ব সৈন্যবাহিনী নিয়ে উসমান বাহিনীকে শক্তিশালী করে তোলেন।৪৪-পরগনার দৌলম্ভপুর গ্রামে তারা সমবেত হন।সেখান থেকে মাত্র দেড়মাইল দূরে ছিল মুঘলবাহিনীর শিবির।১৬১২ সালের ১২ মার্চ, রোববার ভোরবেলা মুঘলবাহিনী প্রথম আক্রমণ পরিচালনা করে।ক্রমেই উভয়পক্ষের আক্রমণ তীব্র হয়ে উঠে।দুপুরবেলা মুঘল সৈনিক আব্দুল জলীল শেখের নিক্ষিপ্ত তীরের আঘাতে খাজা উসমান নিহত হন।
বায়েজিদ কররানীঃ সম্রাট জাহাংগীরের আমলে তিনি সিলেটে রাজা ছিলেন।বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আফগান সর্দার তার বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন।খাজা উসমা্নের সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল।খাজা উসমা্নের পতন সংবাদে বায়েজিদ আত্মসমর্পণ করেন।বায়েজি্দের পতনে মুঘলদের বিরুদ্ধে আজাদী আন্দোলনের শেষ স্ফুলিংগ নিভে যায় এবং গোটা বাংলা দিল্লী সাম্রাজ্যের অধীনে আসে।
বারো ভুঁইয়া
মোগল সম্রাট আকবর এর আমলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল শাসনকারী কতিপয় জমিদার বা ভূস্বামী বারো জন এমন শাসক ছিলেন যাদেরকে বোঝানো হতো বারো ভূঁইয়া বলে । বাংলায় পাঠান কররানী বংশের রাজত্ব দূর্বল হয়ে পড়লে বাংলাদেশের সোনারগাঁও এবং খুলনা ও বরিশাল বিভিন্ন অঞ্চলে কিছু সংখ্যক জমিদার স্বাধীন রাজার মতো রাজত্ব করতে থাকেন । সম্রাট আকবর ১৫৭৫ সালে বাংলা দখল করার পর এসকল জমিদার ঐক্যবদ্ধ হয়ে মোগল সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন । বারো ভুঁইয়া নামে পরিচিত এই সকল জমিদার গণ হলেনঃ
১। ঈসা খাঁ খিজিরপুর বা কত্রাভূ ।
২। প্রতাপাদিত্য যশোর বা চ্যাণ্ডিকান ।
৩। চাঁদ রায় কেদার রায় শ্রীপুর বা বিক্রমপুর ।
৪। কন্দর্প রায় এবং রামচন্দ্ররায় বাকলা বা চন্দ্রদ্বীপ ।
৫। লক্ষ্মণমাণিক্য ভুলুয়া ।
৬। মুকুন্দরাম রায় ভূষণা বা ফতেহাবাদ ।
৭। ফজল গাজী ভাওয়াল এবং চাঁদপ্রতাপ ।
৮। হামীর মল্ল বা বীর হাম্বীর বিষ্ণুপুর ।
৯। কংসনারায়ন তাহিরপুর ।
১০। রামকৃষ্ণ সাতৈর বা সান্তোল ।
১১। পীতম্বর ও নীলম্বর পুঁটিয়া ।
১২ ।ঈশা খাঁ লোহানী এবং উসমান খাঁ লোহানী উড়িষ্যা ও হিজলী ।
সম্রাট আকবর ১৫৫৬ সাল থেকে ১৬০৫ সাল তাঁর জীবদ্দশায় সমগ্র বাংলার উপর মুঘল অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হতে পারেননি । কারণ বাংলার বড় বড় জমিদারেরা স্বাধীনতা রক্ষার জন্যে মুঘলদের বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়তেন । তারা বারভূঁইয়া নামে পরিচিত ।এখানে বার বলতে অনির্দিষ্ট সংখ্যা বুঝায় ।
ঈসা খাঁ বারভূঁইয়াদের নেতা ছিলেন ।মুঘল সেনাপতি মানসিংহ জীবনে দুইব্যক্তিকে পরাজিত করতে পারেননি ১ জন চিতরের রানা প্রতাপ সিং ২য় জন হলেন ঈসা খাঁ । ১৫৩৭ সালে ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার সরাইল পরগণায় ঈসা খাঁর জন্ম হয় । তার পিতা কালিদাস গজদানী ভাগ্যান্বেষণে অযোধ্যা থেকে গৌড়ে এসে স্বীয় প্রতিভা গুণে রাজস্বমন্ত্রী পদে উন্নীত হন । পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তার নাম হয় সুলাইমান খাঁ ।তিনি সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের ১৫৩৩ সাল থেকে ৩৮ সালে মেয়েকে বিয়ে করে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার সরাইল পরগণা এবং পূর্ব মোমেনশাহী অঞ্চলের জায়গীরদারী লাভ করেন ।১৫৪৫ সালে শের শাহের পুত্র ইসলাম শাহ দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করার পর সুলাইমান খাঁ দিল্লীর আনুগত্য অস্বীকার করলে কৌশলে তাকে হত্যা করে তাঁর দুই নাবালক পুত্র ঈসা খাঁ এবং ইসমাইল খাঁকে একদল তুরানী বণিকের নিকট বিক্রি করা হয় ।১৫৬৩ সালে ঈসা খাঁর চাচা কুতুব খাঁ রাজকার্যে নিযুক্তি লাভ করে বহু অনুসন্ধানের পর সুদূর তুরান দেশের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছ থেকে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে দুই ভাতিজাকে উদ্ধার করেন । এই সময় ঈসা খাঁর বয়স মাত্র ২৭ বছর ।সুলতান তাজ খাঁ কররানী ১৫৬৪ সাল থেকে ৬৫ সাল সিংহাসনে আরোহণ করে ঈসা খাঁকে তাঁর পিতার জায়গীরদারী ফেরত দেন । বাংলার শেষ স্বাধীন সুলতান দাউদ খাঁ কররানীর রাজত্বকালে ১৫৭২ সাল থেকে ৭৬ সাল ঈসা খাঁ বিশেষ প্রতিপত্তি লাভ করেন অসাধারণ বীরত্বের জন্যে ।
১৫৭৫ সালের অক্টোবর মাসে বাংলার সুবাদার মুনিম খাঁর মৃত্যু হলে আফগান নেতা দাউদ খাঁ কররানী স্বাধীনতা ঘোষণা করে নিজ নামে বাংলা এবং বিহারে খুতবা পাঠ করান ।স্বাধীন ভূঁইয়ারাও তাকে অনুসরণ করে মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেন ।
এরপর অনেক বীরত্বগাথাঁ রচিত হয় ।সর্বশেষ ১৫৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বিক্রমপুর হতে ১২ মাইল দূরে ঈসা খাঁ ও মাসুম খাঁ কাবুলীর সম্মিলিত বাহিনী দুর্জন সিংহকে মানসিংহের ছেলে বাধা দিলে দুর্জন সিংহ বহু মুঘল সৈন্যসহ নিহত হন ।অনেকে বন্দী হন । কিন্তু সুচতুর ঈসা খাঁ মুঘলদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা উচিত বলে মনে করে আকবরের বশ্যতা স্বীকার করে নেন ।তিনি বন্দীদের মুক্তি দেন এবং মানসিংহের সাথে আগ্রায় গিয়ে সম্রাট আকবরের সাথে সাক্ষাত করেন ।সম্রাট এ বীর পুরুষকে দেওয়ান ও মসনদ ই আলা উপাধিতে ভূষিত করেন ।১৫৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তার মৃত্যু হয় ।
মাসুম খাঁ কাবুলীঃ তিনি প্রথমে সম্রাট আকবরের সেনাপতি ও বাংলার শাসনকার্যে নিয়োজিত ছিলেন।আকবরের "দ্বীন-ই-এলাহী" প্রবর্তন করলে মুঘল কর্মকর্তারা বাংলায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।মাসুম খাঁ ছিলেন বিদ্রোহীদের অন্যতন নেতা।জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি মুঘল বিরোধীতা অক্ষুণ্ন রাখেন।১৫৯৯ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
মুসা খাঁ---- ঈসা খাঁর পুত্র মুসা খাঁ সম্রাট জাহাংগীরের আমলে (১৬০৫-২৭) ভূঁইয়াদের মধ্যে সর্বাপাক্ষা শক্তিশালী ছিলেন।তিনি মুঘল আনগত্য অস্বীকার করে তাদের বিরুদ্ধে আজীবন যুদ্ধ করেন।বৃহত্তর ঢাকা,কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ জেলার অধিকাংশ স্থান নিয়ে তাঁর রাজত্ব গঠিত হয়েছিল।সোনারগাঁ ছিল তাঁর রাজধানী।১৬১১ সালের এপ্রিল মাসে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে সোনারগাঁয়ের পতন ঘটে।মুসা খাঁ মুঘলদের আনুগত্য স্বীকার করেন।
ফজল গাজী তিনি শেরশাহ এবং সম্রাট আকবরের সমসাময়িক।বীরত্বের জন্য খ্যাতি অর্জন করেন।মুঘলদের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করেন।
বাহাদুর গাজীঃ তিনি তাঁর বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে মুঘলদের বিরুদ্ধে মুসা খাঁকে যথেষ্ট সাহায্য করেন।মুসা খাঁ পরাজিত হলে বাহাদুর গাজী মুঘলদের পক্ষে যোগদান করে যশোর ও কামরূপ অভিযানে অংশ নেন।
খাজাউসমান খাঁ লোহানী তিনি কখনো মুঘলদের আনুগত্য স্বীকার করেননি এবং প্রাণ বিসর্জন দেন।তিনি ২ হাজার অশ্বারোহী, ৫ হাজার পদাতিক ও ৪০ টি হস্তীর এক বাহিনী নিয়ে মুঘলবাহিনীর গতিরোধ করতে উষার ত্যাগ করেন।শেরে ময়দান,খাজা ইব্রাহীম এবং খাজা দাউদ প্রমুখ আফগান নেতৃবৃন্দ স্ব স্ব সৈন্যবাহিনী নিয়ে উসমান বাহিনীকে শক্তিশালী করে তোলেন।৪৪-পরগনার দৌলম্ভপুর গ্রামে তারা সমবেত হন।সেখান থেকে মাত্র দেড়মাইল দূরে ছিল মুঘলবাহিনীর শিবির।১৬১২ সালের ১২ মার্চ, রোববার ভোরবেলা মুঘলবাহিনী প্রথম আক্রমণ পরিচালনা করে।ক্রমেই উভয়পক্ষের আক্রমণ তীব্র হয়ে উঠে।দুপুরবেলা মুঘল সৈনিক আব্দুল জলীল শেখের নিক্ষিপ্ত তীরের আঘাতে খাজা উসমান নিহত হন।
বায়েজিদ কররানীঃ সম্রাট জাহাংগীরের আমলে তিনি সিলেটে রাজা ছিলেন।বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আফগান সর্দার তার বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন।খাজা উসমা্নের সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল।খাজা উসমা্নের পতন সংবাদে বায়েজিদ আত্মসমর্পণ করেন।বায়েজি্দের পতনে মুঘলদের বিরুদ্ধে আজাদী আন্দোলনের শেষ স্ফুলিংগ নিভে যায় এবং গোটা বাংলা দিল্লী সাম্রাজ্যের অধীনে আসে।

0 মন্তব্য(গুলি):
Speak up your mind
Tell us what you're thinking... !